ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে চলছে অবৈধ ভাটা

ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে অবৈধ ভাটা ,নেত্রকোনা জেলায় ৩৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টিই অবৈধ। এসব ভাটায় ফসলি জমির মাটি দিয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে।সরকারি আইন লঙ্ঘন করে কৃষিজমিতে এবং আবাসিক এলাকা ও রেলপথের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা। একইভাবে আইন লঙ্ঘন করে এসব ইটভাটায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। কয়লার বদলে ইট পোড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। অধিকাংশ ভাটারই লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্রও নেই। এসব অবৈধ ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত এবং ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এই অবৈধ ভাটাগুলো নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায়।

 

ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে চলছে অবৈধ ভাটা

 

ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে চলছে অবৈধ ভাটা

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, নেত্রকোনা জেলায় ৩৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টিই অবৈধ। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অবৈধ ইটভাটাগুলোতে দেদার কাঠ পুড়িয়ে এবং ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরি করা হচ্ছে।

অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন–২০১৩ আইনের ৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, কৃষিজমি, পাহাড় ও টিলার মাটি কেটে ইট তৈরি করা যাবে না। ওই আইনের ৬ নম্বরে ধারায় বলা হয়েছে, জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো যাবে না। এ ছাড়া এই আইনের ৮ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষিজমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, ডিগ্রেডেড এয়ার শেডে ইটের ভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ ছাড়া সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এবং বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল-ক্লিনিক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপনে ছাড়পত্র ও লাইসেন্স দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, এটা ঠিক নয়। প্রশাসন অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অবৈধ ভাটায় অভিযান পরিচালনা করে জরিমানাসহ কয়েকটি ভাটা ভেঙে দিয়েছেন।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে কাযক্রম চালু থাকা ইটভাটাগুলোর মধ্যে সদর উপজেলায় ৮টি, বারহাট্টায় ৩টি, কলমাকান্দায় ৪টি, দুর্গাপুরে ১টি, কেন্দুয়ায় ১১টি, আটপাড়ায় ২টি, মদনে ২টি, মোহনগঞ্জে ২টি ও পূর্বধলায় ১টি। এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে গত বছরে নেত্রকোনা পরিবেশ অধিদপ্তরে তৎকালীন পরিদর্শক সুশীল কুমার দাস বাদী হয়ে নেত্রকোনা স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। পরে আদালতের বিচারক ভাটাগুলোকে গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আইনসম্মত ও পরিবেশসম্মত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতের ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে সদরের ঠাকুরোকোনার মেসার্স এমআরএস ব্রিকস, দুর্গাপুরের মেসার্স পিএন কো ব্রিকসসহ কয়েকটি ভাটা পরিবেশ আদালতে আপিল করলেও পরিবেশ আদালত ওই আপিল খারিজ করে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায় বহাল রাখেন। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর তা বাস্তবায়ন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর পৃথক অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ভাটায় কেবল জরিমানা করেই দায় সেরেছে। জরিমানার পর আরও ইট প্রস্তুত করতে দেখা গেছে অবৈধ এসব ভাটাকে। শুধু তা–ই নয়, ইটভাটায় কাঠও পোড়ানো হচ্ছে নির্বিচার।

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, কলমাকান্দার গুমাই নদের তীরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হিরাকান্দা এলাকায় ‘পিসিবি ব্রিকস’ নামের ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ওই ভাটার পাশেই একটি বিদ্যালয়ও রয়েছে।

ওই ভাটার একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়লার দাম বেশি হওয়ায় জ্বালানি কাঠ এনে ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে। সাংবাদিকদের ভয়ে বিভিন্ন বাড়িতে স্তূপ করে ও নদীতে এসব কাঠ রাখা হয়।

ভাটাসংলগ্ন গুমাই বাজারের একজন মুদি ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবৈধ এই ইটভাটা নানাভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছে। ধোঁয়ার গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যায়। গাছগাছালির ফল ঝরে যায়। দেখেন, মাত্র ২০০ গজ দূরে পনারপারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। রাস্তা, বাজার, ঘরবাড়ি, নদী, ফসলি জমি—সবকিছুর ক্ষতি হচ্ছে। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে। জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এরপরও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পিসিবি ব্রিকসের মালিক দেলোয়ার হোসেন খান ফোন ধরেননি।

নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রেলপথের কাছে অন্তত চারটি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনায় সড়ক ও রেলপথসংলগ্ন মেসার্স এমআরএস ব্রিকসের মালিক খোকন চন্দ্র সিংহ, বারহাট্টা উপজেলার পাটলি গ্রামে রেলপথ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘেঁষে আরএমবি ব্রিকসের মালিক আবুল খায়ের আকন্দ জানান, ইটভাটা স্থাপনের সময় পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিয়েছে। তখন ছাড়পত্র না দিলে তো ইটভাটা স্থাপন করতে পারতাম না। এখন চাইলেই সহজে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এতে অনেক লোকসান হবে।

ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পারভেজ আহম্মেদ মুঠোফোনে বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু জরিমানা করা হয়েছে। আর ইটভাটা থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। আমার বিরুদ্ধে এটা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (উপসচিব) দিলরুবা আহমেদ বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন তাঁরা। তবে পরিবেশ কার্যালয়ে মাত্র একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকায় পুরো বিভাগ সামলাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।’

 

ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে চলছে অবৈধ ভাটা

 

Leave a Comment